ভুট্টা ও ফিড তৈরির কাঁচামালের বাজারে অস্থিরতা
* কারসাজি, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ-চরম চাপের মুখে পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য শিল্প।
* কাঁচামালের দামে লাগামহীন ওঠানামা। বাড়ছে ফিডের উৎপাদন ব্যয়। শঙ্কায় খামারি ও উদ্যোক্তারা।
* সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো ফিডের ভুট্টার বড় অংশ আমদানি নির্ভর; ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৫৭,৮৫৫ টন মার্কিন ভুট্টাও দেশে এসেছে এবং আমদানিকারকদের হিসাবে দেশের ভুট্টার চাহিদার প্রায় ৭০% আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। সূত্র: The Daily Star
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা, সয়াবিন মিল ও অন্যান্য উপকরণের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা। কাঁচামালের প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের পাশাপাশি বাজারে মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কাঁচামালের বাজারে এ ধরনের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ফিডের দামে। আর ফিডের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে পোল্ট্রি, পশু ও মাছের খামারে। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা গিয়ে পড়বে ডিম, মুরগি ও মাছের বাজার এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর।
কিছু গ্রুপ কোম্পনি অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের জন্য কাঁচামালের কৃত্রিম সংকট তৈরী করছে, অভিযোগ আছে ক্রয় আদেশ এর শর্ত অনুযায়ী পুর্বনিধা'রীত পরিশোধকৃত দামে কাঁচামাল (বিশেষত ভুট্টা) ফিড প্রস্তুকারক প্রতিষ্ঠান কে সরবারাহ না করে সুযোগ বুজে বাড়তি দাম এ কাঁচামাল নেওয়ার জন্য বাধ্য করছে।
ভুট্টা-ফিড শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল:
পোল্ট্রি ফিডে ভুট্টা একটি প্রধান উপাদান এবং পশু ও মৎস্য খাদ্যেও ভুট্টা ও সয়াবিনজাত উপকরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের ফিড শিল্পের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আট বছর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৫৮ হাজার টন ভুট্টার একটি বড় চালান বাংলাদেশে আসে। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভুট্টার চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদন থেকে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, ডলার বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া, বন্দর ও খালাস প্রক্রিয়া-সবকিছুর প্রভাব পড়ে দেশের ভুট্টার বাজারে।
প্রশ্ন উঠছে-দাম বাড়ার পেছনে প্রকৃত কারণ কতটা?
শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজার বা আমদানি ব্যয়ের উঠানামাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো কোনো পর্যায়ে কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও যদি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়, বড় পরিমাণে কাঁচামাল মজুত করে রাখা হয় কিংবা প্রত্যাশিত দামের চেয়ে বেশি দামে পর্যায়ক্রমে বাজারজাত করা হয়-তাহলে সেটি স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট সত্যতা নির্ধারণে সরকারি পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও বাজার মনিটরিং জরুরি।
কাঁচামালের সংকট মানেই পুরো শিল্পে সংকট ঃ
ফিড শিল্পে কাঁচামালের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু ফিড মিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ধাপে ধাপে পৌঁছে যায় পুরো ভ্যালু চেইনে।
(ভুট্টার দাম বাড়লে, ফিডের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ফিডের দাম বাড়লে, খামারের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। মুরগি/ডিম/মাছের উৎপাদন খরচ বাড়বে ফলে, বাজারে মূল্যচাপ তৈরি হবে। অন্যদিকে বাজারে উৎপাদিত পণ্যের দাম একই হারে না বাড়লে খামারির লাভের মার্জিন দ্রুত কমে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে ছোট ও মাঝারি খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। পোল্ট্রি শিল্পের ফিড প্রস্তুতকারক মালিকগণ এর আগেও কাঁচামাল আমদানির ওপর কর ও অন্যান্য ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপ পড়বে। এসব নিয়ে তাঁরা জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনও করেছেন।
‘কাঁচামাল সিন্ডিকেট’- পোল্ট্রি শিল্পে বাড়ছে আলোচনা, সমালোচনা ঃ
বর্তমান পরিস্থিতিতে পোল্ট্রি ও ফিস ফিড শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো-কাঁচামাল আমদানি ও বাজারজাতকরণে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা সমন্বিত মূল্যনির্ধারণ হচ্ছে কি না। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এ বিষয়ে অনুমান বা অভিযোগের পরিবর্তে সরকারের উচিত আমদানি তথ্য, এলসি, বন্দরে আসা পণ্য, গুদামজাতকরণ, মজুত ও বিক্রয়মূল্যের একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করা। কোন আমদানিকারক কত টন ভুট্টা আমদানি করেছেন, কী দামে এনেছেন, কখন বন্দরে এসেছে, কতদিন মজুত রেখেছেন এবং কী দামে বিক্রি করেছেন-এসব তথ্য স্বচ্ছ হলে বাজারে কারসাজির সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।
শিল্পের দাবি: ‘মূল্য নির্ধারণ নয়, স্বচ্ছ বাজার চাই’
ফিড শিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, তারা কোনো কৃত্রিমভাবে কম দাম চান না। তারা চান একটি স্বাভাবিক, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও প্রকৃত আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাঁচামালের দাম নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ভুট্টা উৎপাদন বাড়ানো, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি শিল্পে ভুট্টা সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ
১. বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারি হচ্ছে কি না-তা শনাক্ত করা।
২. আমদানি থেকে খামারি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় মূল্যস্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৩. স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা।
বাংলাদেশের ফিড শিল্পের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঁচামালের চাহিদাও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শিল্প বিশ্লেষণেও বাংলাদেশে ফিড উৎপাদন ও চাহিদা বৃদ্ধির প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পাদকীয় প্রশ্ন: ‘কাঁচামালের বাজার কে নিয়ন্ত্রণ করছে?’
পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাত দেশের মানুষের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষ সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস। এই খাতের উৎপাদন ব্যয় যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে শুধু খামারি নয়-ভোক্তাও ক্ষতিগ্রস্থ হবেন।
তাই, এখন সময় এসেছে কাঁচামালের বাজারকে ‘অদৃশ্য হাতের’ ওপর ছেড়ে না দিয়ে তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করার।
ভুট্টা বা সয়াবিন মিলের দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ যদি আন্তর্জাতিক বাজার বা আমদানি ব্যয় হয়-তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। আর যদি কোথাও মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফার প্রমাণ পাওয়া যায়-তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ প্রশ্নটি শুধু ভুট্টার দাম নিয়ে নয়-প্রশ্নটি দেশের পোল্ট্রি, পশুখাদ্য ( ডেইরি ও ক্যাটেল) ও মৎস্য শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
“কাঁচামালের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে খামারি টিকবে না, ফিড শিল্পও টেকসই হবে না; আর এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের পাতে।”

