১৬/০৬/২০২৬; সাভার, ঢাকা
আগামীতে গবেষণা খাতে আরও বেশি বরাদ্দ প্রদান করা হবে। গবেষণা ছাড়া দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না।গবেষণা বিষয়ে সরকার কোন কৃপণতা করবে না। তবে প্রকৃত অর্থে গবেষণা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)” শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্পের সমাপনী কর্মশালা উদ্বোধনকালে আজ সকালে সাভারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্র্রী জনাব মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ মহোদয় একথা বলেন।
মহিষ পালনকে জনপ্রিয় করার জন্য তিনি গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, উন্নত দেশসমূহে মহিষ দুধের অনেক বড় একটি উৎস্য। আমাদের দেশের চরাঞ্চলে তুলনামূলক কম কৃষি কাজ হয়। এখানে যদি আমরা লবণাক্ত মাটির জন্য উপযোগী লবণ সহিষ্ণু জাতের ঘাস চাষ করতে পারি, তবে মহিষ পালনের একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে কৃষি কাজের জন্য জায়গার স্বল্পতা দেখা যাবে। তাই কম জায়গায় কিভাবে মহিষ পালন করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
এসময় তিনি আরও বলেন, এদেশের ৭৫ ভাগ মানুষ কৃষির সাথে জড়িত। তাই কৃষির অর্থনীতি এদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকে যুগোপযোগী করার জন্য গবেষণারও গুরুত্ব রয়েছে।
এর আগে সকালে মন্ত্রী মহোদয় বিএলআরআইতে পৌঁছানোর পরে বিএলআরআই এর ছাগল গবেষণা খামার পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি বলেন, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস। আমরা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আবার ছড়িয়ে দিতে চাই।

সমাপনী কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব জনাব মো. দেলোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এর উপাচার্য প্রফেসর ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। সম্মানীয় অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জনাব মো. শাহজামান খান। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক।
সকাল ০৯.৩০ ঘটিকায় ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে (চতুর্থ তলা) পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হতে পাঠের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু্ হয়। এরপর আমন্ত্রিত অতিথিদের উদ্দেশ্যে স্বাগত বক্তব্য এবং মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও অর্জন তুলে ধরেন প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআই এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গৌতম কুমার দেব। এসময় তিনি প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমের ফলাফল এবং প্রকল্পের ভৌত ও অবকাঠামোগণ অর্জনসমূহও তুলে ধরেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পরে প্রকল্পের উপকারভোগী একজন খামারিও তার অনুভূতি ব্যক্ত করেন এবং খামারের গল্প তুলে ধরেন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন।
বিশেষ অথিতির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মৌলিক গবেষণার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রকল্প হতে যে সকল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও বিএলআরআই এর মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক তার সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কর্মশালাটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, আমাদের দেশে মহিষের সংখ্যা কম, মহিষের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্প হতে যে সকল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে, তা দেশের মহিষের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সমাপ্তির পরে অনুষ্ঠিত হয় কারিগরি সেশন। এসময় প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত গবেষণা কার্যক্রমসমূহের বিস্তারিত বিবরণ ও ফলাফল উপস্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআই এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গৌতম কুমার দেব। এসময় প্রকল্পের কার্যক্রমসমূহের বিষয়ে বক্তব্য রাখেন বিএরআরআই এর সাবেক মহাপরিচালকগণ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত অধ্যাপক ও শিক্ষকগণ এবং বিভিন্ন সংগঠন থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ।
উক্ত কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিবৃন্দ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, মহিষ সংক্রান্ত কাজের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও প্রতিনিধিবৃন্দ, বিএলআরআই এর বিভিন্ন পর্যায়ের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অর্জন
মহিষ সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দেশীয় মহিষের জাত সংরক্ষণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকল্পে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থায়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধায়নে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট “মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন” শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রারম্ভিকভাবে প্রকল্পের সময়কাল নির্ধারণ করা হয় জুলাই’ ২০২০ হতে জুন’ ২০২৫ পর্যন্ত এবং প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয় ৬২.১৩ কোটি টাকা। পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদকাল জুন’২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় এবং প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৭২.১১ কোটি টাকা। দেশের ০৭ টি বিভাগের ১২ টি জেলার ১২ টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়।
প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্যসমূহ হলো- দেশি নদীর মহিষের দুধ উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য জাত উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ; দেশে উৎপাদিত সংকর (মুররাহ×দেশি) জাতের মহিষের F1 প্রজন্মের উৎপাদনশীলতা যাচাই ও F1 প্রজন্মের বাচ্চা উৎপাদন; দেশীয় আবহাওয়ায় অভিযোজনের লক্ষ্যে বিশুদ্ধ মুররাহ জাতের মহিষের সিলেকটিভ ব্রিডিং কার্যক্রম গ্রহণ ও G1 প্রজন্মের বাচ্চা উৎপাদন এবং লাভজনক মহিষ পালন ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে নুন্যতম ৫টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও খামারি পর্যায়ে অভিযোজন।
এসব উদ্দেশ্য পূরণে প্রকল্পের আওতায় দেশী জাতের মহিষের কৌলিকমান উন্নয়নের জন্য অধিক দুধ উৎপাদনশীল ৫০টি গাভী ও ১৫টি ষাঁড় মহিষ সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়াও, বিশুদ্ধ মুররাহ জাতের মহিষের একটি নিউক্লিয়াস হার্ড গঠনের জন্য ৪৫টি গাভী, ৫টি ষাঁড় এবং ৩৭টি বাছুর সংগ্রহ করা হয়েছে। বিএলআরআই প্রধান কার্যালয়, সাভার, ঢাকায় ৭টি এবং বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, গোদাগাড়ী, রাজশাহীতে ৬টি শেড এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীন রাস্তা, মাস্টার ড্রেন, পানি সরবরাহ সংযোগ ইত্যাদি ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩টি অফিস কাম গবেষণা ভবনের উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং বিদ্যমান গবেষণাগারের জন্য প্রয়োজনীয়তার নিরিখে প্রায় ১৫০টি গবেষণা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় একটি ট্রাক্টর, ট্রাক্টর ট্রলি, হ্যাসলার, স্লাসার, ফডার চপার, হিট ডিটেক্টর, মহিষের ওজন নেওয়ার স্কেল, হ্যান্ড ফিড ট্রলি ইত্যাদি খামার সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প এলাকার খামারিদেরকে ফডার চাষে উৎসাহিত করার জন্য ফডার কাটিং বিতরণ করা হয়েছে এবং খামারিদের মহিষে প্রায় ৩০,০০০ ডোজ কৃমিনাশক ও ৩২,০০০ ডোজ টিকা প্রদান করা হয়েছে। খামারিদের বাসায় চলমান গবেষণা ট্রায়ালের মাধ্যমে বিভিন্ন খাদ্য উপকরণও প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়াও প্রকল্পের আওতায় ১৬৫০ জন মহিষ পালনকারী খামারি ও ১০০ জন উদ্যোক্তাকে মহিষ পালন বিষয়ে এবং ১০৪ জন কর্মকর্তা ও ৬০ জন কর্মচারীরকে আভ্যন্তরীন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বিএলআরআই এর রাজস্বখাতের ২ জন বিজ্ঞানীকে বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১০টি গবেষণা ক্ষেত্রে ১৯টি গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাস্তবায়িত প্রধান প্রধান গবেষণা কার্যক্রমসমূহ হলো- সংকর জাতের মহিষের উৎপাদনশীলতা মূল্যায়ন; দেশি মহিষের জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; প্রজনন সম্পৃক্ত জীব-প্রযুক্তি ব্যবহার পূর্বক দেশি মহিষের সংখ্যা বৃদ্ধিকরণ; মহিষের দুধে ফ্যাট এবং আমিষ উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত মার্কার জিন সনাক্তকরণ; রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি, কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন; অধিক দুধ উৎপাদনক্ষম মহিষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন; নিরাপদ মহিষের মাংস উৎপাদনের জন্য মহিষ হৃষ্টপুষ্টকরণ মডেল উদ্ভাবন; মহিষের দুধ থেকে খাদ্যজাত পণ্য উদ্ভাবনের এসওপি এবং খামারি পর্যায়ে দুধের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধির প্রযুক্তি উন্নয়ন; মহিষ খামারে পরিবেশ-বান্ধব ও উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খামারের আয় বৃদ্ধি এবং খামারি পর্যায়ে মহিষ পালনের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন।
এসব গবেষণা কার্যক্রমের আওতায় ইতোমধ্যেই বেশ কিছু প্রযুক্তি উন্নয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- মহিষ পালনে রোটেশনাল পদ্ধতিতে পাকচং ফডার উৎপাদন, বাছুর মহিষ পালনে প্রোটিন সমৃদ্ধ পিলেট স্টার্টার উদ্ভাবন, মহিষে গলাফোলা রোগের জীবাণু সনাক্তকরণে চিটোসান-গ্রাফিন-ভিত্তিক ন্যানোবায়ো সেন্সর ডিভাইস উদ্ভাবন, মহিষের বাছুরে গোলকৃমি নিয়ন্ত্রণে প্রথমবার কৃমিনাশক প্রদানের উপযুক্ত বয়স নির্ধারণ, খামারের বর্জ্য পানির পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে স্বল্প খরচে ফডার উৎপাদন প্রযু্ক্তি উদ্ভাবন, মহিষে কৃত্রিম প্রজনন সহায়ক পেনিস সদৃশ ডিভাইস উদ্ভাবন, স্বাস্থ্যকর ফাইবারযুক্ত দুগ্ধ পণ্য উদ্ভাবন, মার্কার সহায়ক প্রজনন মহিষ নির্বাচন এবং দুগ্ধ পণ্যের ভ্যালুএডিশন (পনির ও রসমালাই)। এছাড়াও প্রকল্পের গবেষণা ফলাফল থেকে ১৪টি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং ৫০ টির অধিক প্রবন্ধ সেমিনার/কনফারেন্স এর প্রসেডিংয়ে ও বিএলআরআই জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।