‘বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন’ (বিপিআইএ) কর্তৃক জাতীয় প্রেস ক্লাবে “মানববন্ধন ও সাংবাদিক সম্মেলন” অনুষ্ঠিত
১১ জুলাই-২০২৬, শনিবার, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা ঃ উক্ত জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত প্রান্তিক খামারিবৃন্দ, বিপিআইএ এর সভাপতি-মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, সহ সভাপতি-কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান মেজবা, মহাসচিব-এম সাফির রহমান, যুগ্ম মহাসচিব-কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার, উপদেষ্টা-কৃষিবিদ নারায়ন চন্দ্র বনিক সহ বিপিআইএ’র উর্ধ্বতন কর্মকর্তবৃন্দ। নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সাংবাদিক সম্মেলনের পূর্বে সবাই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মুখ সড়কে মানববন্ধন করেন এবং বক্তব্য প্রদান করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে মোশাররফ হোসেন চৌধুরী-সভাপতি, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন (বিপিআইএ) এর লিখিত বক্তব্য হুবহু পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।
বিষয়: খামারিদের ডিমের লাভজনক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিতকরণ, পোল্ট্রি খামারিদের ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু এবং প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া।
সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ, উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, প্রিয় খামারি ভাই ও বোনেরা এবং উপস্থিত সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আমরা দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার স্বার্থে, এমন একটি বিষয় নিয়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি, যা শুধু পোল্ট্রি খাতের নয়, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দেশের হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন তারা লোকসান গুনছেন, ক্রমে ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন- এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে ভোক্তাদেরও বেশি মূল্য দিতে হবে।
আজ আমরা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; বরং একটি টেকসই সমাধানের দাবিতে আপনাদের সামনে এসেছি।
সম্মানিত উপস্থিতিবৃন্দ,
পোল্ট্রি শিল্প আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক শিল্প; এই শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং দেশের প্রাণিজ আমিষের একটি বড় অংশের যোগান দিচ্ছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি প্রান্তিক খামারিরা আজ সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বর্তমানে ফিড, বাচ্চা, ঔষধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের মূল্য বেড়েছে কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে ফার্মগেট বাজারমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে খামারিরা প্রতিনিয়ত লোকসানের বোঝা বহন করছেন। এই চলমান সংকট থেকে উত্তরণে সরকার, বেসরকারি খাত এবং খামারিদের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি, সাথে আপনারা সন্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ এবং ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া- খামারিদের এই সংকট লাঘবে পাশে দাঁড়ালে পোল্ট্রি শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমি আন্তরিক ভাবে বিশ্বাস করি। একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, ২০২০ সালের আগে বাংলাদেশে পোল্ট্রি খামারির সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে এই সংখ্যা কমে বর্তমানে প্রায় ১ লক্ষ ৩৬ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামারী এই খাত থেকে ঝরে পড়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঝরে পড়ার প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে আরও বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি পোল্ট্রি উৎপাদন থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন, যা দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং পোল্ট্রি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
আমাদের প্রথম দাবি হলো-ডিমের ন্যূনতম লাভজনক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকের ধান বা আখের মতো পোল্ট্রি খাতেও একটি যৌক্তিক মূল্য (ফেয়ার প্রাইস) সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা উচিত। উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন এবং এই মূল্য সময়ের সাথে সাথে সমন্বয় করতে হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো-
সারাদেশের পোল্ট্রি খামারিদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, প্রকৃত উৎপাদন, চাহিদ ও যোগান সম্পর্কে রিয়েল টাইমে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। আজও আমরা জানি না দেশে প্রকৃতপক্ষে কতটি খামার রয়েছে, কত উৎপাদন হচ্ছে, কোথায় কত ডিম উৎপাদিত হচ্ছে কিংবা কোথায় ঘাটতি রয়েছে- এই তথ্যের অভাবে উৎপাদন পরিকল্পনা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সহায়তা কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
সারা দেশের খামারিদের একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু হলে-
* প্রকৃত খামারিদের সহজে শনাক্ত করা যাবে এবং খামারিদের ঝরে পড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
* উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
* সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ সরাসরি প্রকৃত খামারিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
* রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান ও বায়োসিকিউরিটি কার্যক্রম আরও দৃঢ়ভাবে কার্যকর করতে হবে।
* চাহিদা বৃদ্ধির সাথে ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনা বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে গ্রহণ করা যাবে।
আমরা প্রত্যেক নিবন্ধিত খামারির জন্য একটি খামারি পরিচয়পত্র (ঋধৎসবৎ ওউ) চালুরও দাবি জানাই।
সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ,
আমাদের বিশ্বাস, প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে গ্রামীণ অর্থনীতি কখনো শক্তিশালী হবে না এবং শহরমুখী মানুষের অনিশ্চিত অভিবাসন বাড়তেই থাকবে, তাই আমরা বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কয়েকটি বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
প্রথমত, উপজেলা পর্যায়ে ডিম সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের সময় খামারিরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না ও তাঁদের পূজির সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে- এতে খামারিরা কম দামে উপকরণ কিনতে পারবেন এবং যৌথভাবে ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
তৃতীয়ত, স্বল্পসুদে সহজ শর্তে ঋণ, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি এবং নিয়মিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে; এতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, খরচ কমবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
চতুর্থত, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব কমাতে কার্যকর বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।
সম্মানিত উপস্থিতিবৃন্দ ও উপস্থিত সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
গত তিন দশকে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প, সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ প্রচেষ্টায় আজকের অবস্থানে এসেছে; তাই এই শিল্পকে রক্ষা করাও আমাদের সকলের যৌথ দায়িত্ব।
আমরা সরকারের প্রতি তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয় আন্তরিক আহ্বান জানাই-
* ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের উৎপাদিত ডিমের লাভজনক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করুন।
* জাতীয় পোল্ট্রি ডিজিটাল ডাটাবেজ অবিলম্বে চালু করুন।
* নিবন্ধিত খামারিদের জন্য ঋধৎসবৎ ওউ চালু করুন।
* প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করুন ও অবিলম্বে পোল্ট্রি বীমা চালুর উদ্যোগ নিন।
* উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য পোল্ট্রি খামারঘন অঞ্চলে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলুন।
* সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও খামারি সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী পোল্ট্রি শিল্প কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম বা বাংলাদেশ জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করুন।
আমরা কোনো ভর্তুকিনির্ভর শিল্প চাই না; আমরা চাই একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও টেকসই বাজার ব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পাবেন, ভোক্তা সহনীয় দামে নিরাপদ খাদ্য পাবেন এবং দেশ খাদ্য নিরাপত্তায় আরও শক্তিশালী হবে।
পরিশেষে, আমি গণমাধ্যমের বন্ধুদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই-আপনারাই দেশের মানুষের কাছে আমাদের এই বাস্তব সংকট ও যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন, যেমন বিগত দিনগুলোতে দেশের ভোক্তা ও খামারিদের স্বার্থে আন্তরিক ভাবে অবদান রেখেছেন।
আসুন, আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশে এমন একটি পোল্ট্রি খাত গড়ে তুলি, যেখানে খামারি বাঁচবে, উৎপাদন বাড়বে, ভোক্তা নিরাপদ খাদ্য পাবে এবং বাংলাদেশ খাদ্যে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে -ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও ডিম ও মুরগির মাংস রপ্তানির পথ উন্মুক্ত হবে।
পরিশেষে আপনাদের আন্তরিক উপস্থিত ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও আসসালামু আলাইকুম।
তারিখ ১১ জুলাই, ২০২৬ ইং রোজ শনিবার।