বর্তমানে জেনারেল( ক্ষুদ্র ও মাঝারি) ডিম উৎপাদন খামারিদের সংকট ও আর্থিক ঝুঁকি তুলে ধরতে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের নিকট বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের ( বি পি আই এ) আহবান।।
প্রিয় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া থেকে আগত সাংবাদিক প্রতিনিধি ভাই ও বোনেরা, শুরুতে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের ( বি পি আই এ) পক্ষ থেকে আপনাদেরকে পবিত্র মাহে রমজানুল মোবারকের শুভেচ্ছা জানাই।
সন্মানিত সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, আপনারা নিশ্চয় দেশের বিভিন্ন প্রধান মিডিয়াগুলোর সূত্র এবং আপনাদের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অবগত হচ্ছেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি জেনারেল লেয়ার ( ডিম পাড়া মুরগী) খামারিরা চরম আর্থিক বিপর্যয় ও হতাশার গভীরে নিমজ্জিত হয়েছেন।
ফেব্রুয়ারী থেকে জেনারেল (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) লেয়ার খামারিদের উৎপাদিত ডিমের দাম ধারাবাহিকভাবে কমা শুরু হলেও পবিত্র রমজান মাস শুরুর পরে, আরো দ্রুত দরপতনের কারণে বর্তমানে বিভিন্ন জেলা ভেদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা তাঁদের ফার্ম গেইটে ৭.০০-৭.৫০ যা আজকে ৯.১০ টাকায় প্রতি পিস ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কোন স্থানে উল্ল্যেখিত দামেও খামারিরা ডিম বিক্রি করতে পারতেছেন না, প্রতিদিন খামারে অবিক্রীত ডিম জমে যাচ্ছে এবং দেশের বর্তমান আবহাওয়ার উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ২/৩ দিনের মধ্যে ডিম পঁচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকছে, ফলে ডিমের সাপ্লাই চেইন থেকে অনেক ডিম নষ্ট হবে এবং চুড়ান্ত ভাবে সামনের দিনে ডিমের চাহিদার বিপরীতে ঘাটতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের বিগত বছর গুলোর ডিমের বাজারের পর্যবেক্ষণ থেকে যা দেখা যায়, প্রতি বছর পবিত্র মাহে রমজান মাসে দেশে হোটেল রেস্টুরেন্ট,স্কুল কলেজ বন্ধ থাকা ও নানা সামাজিক অনুষ্ঠানাদি তেমন না হওয়াতে এবং বেকারি, বিস্কুট ফ্যাক্টরির উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ডিমের চাহিদা বছরের অন্যান্ন সময়ের তুলনায় অনেকটাই কমে যায়।
বিগত বছরের তুলনায় এবারের ডিমের জেনারেল (ছোট ও মাঝারি খামার) উৎপাদন পর্যায়ে ফার্ম গেইট প্রাইস সর্বকালের সর্বনিম্ন ( বর্তমান উৎপাদন খরচের তুলনায়) পর্যায়ে নেমেছে, যা ছোট ও মাঝারি খামারিদের গভীর হতাশায় ও লোকসানের মধ্যে ফেলেছে।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, জেনারেল খামারিরা এখন যে দামে ডিম বিক্রি করছেন, তাতে তাঁদের প্রতিদিনের মুরগী পালন করতে খাদ্য বাবত যে খরচ হয়, ডিম বিক্রি করে সেই ব্যয়ও উঠছে না। বর্তমানে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ প্রায় ১১.৬৪ টাকার কাছাকাছি। সে হিসাবে প্রতি ডিমে একজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারির লোকসান দাঁড়ায় ২.৫৪ টাকা। ডিমের বর্তমান দামের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে হাজার হাজার জেনারেল লেয়ার খামারি তাঁদের খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন, আমরা আমাদের সংগঠনের বিভিন্ন জেলা উপজেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জানতে পারতেছি যে, অনেক ছোট খামারি লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে উৎপাদনে থাকা ডিম পাড়া মুরগী বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। যা অতি স্বল্প সময়ে রমজান পরবর্তী মাসগুলোতে ডিমের উৎপাদন ও যোগানের ভারসাম্য নষ্ট করবে, পোল্ট্রি ফার্মিং ও ডিম মুরগির বিপননের সাথে জড়িত গ্রামীন জনগোষ্ঠীর লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মচ্যুতির শংকায় পতিত হবেন, অন্যদিকে ভোক্তা বেশি দামে ডিম ক্রয়ের ঝুঁকিতে পড়বেন, এর ফলে ডিমের বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে অতীতের মত সুযোগ সন্ধানী সিজনাল ফড়িয়া সিন্ডিকেট ফায়দা লুটার চেস্টা করবে, যা ভোক্তা, ডিমের খামারি ও নিয়মিত ডিমের সরবরাহের সাথে যুক্ত অংশিজন এবং সরকার কে অস্বস্তিতে ফেলবে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন (বি পি আই এ) মনে করে বাংলাদেশ সরকারের পোল্ট্রি উৎপাদন বিপনন ও বাজার মনিটরিং এর সাথে যুক্ত দায়িত্বশীল মহল থেকে বর্তমান পরিস্থিতিতে ছোট ও মাঝারি খামারিদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এবং দেশের ডিমের প্রাত্যহিক চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য বজায় রাখতে কতিপয় স্বল্প,মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়নের জন্য অতি দ্রুত উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা – বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন আপনাদের মাধ্যমে জেনারেল (খুদ্র ও মাঝারি) লেয়ার খামারিদের দুর্দশার কথা সরকার ও জনগনের কাছে তুলে ধরতে চায়, তার জন্য আজকে বি পি আই এ মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত জেনারেল ডিমের খামারি (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) ভাই ও বোনেরা আপনাদের নিকট সরাসরি নিজেরাই তাঁদের পোল্ট্রি উৎপাদনের ক্ষেত্রে চলমান প্রকৃত সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও তাঁদের টিকে থাকার জন্য সরকারের নিকট দাবি সমুহ তুলে ধরবেন।
সাংবাদিক ভাইয়েরা, আমরা আপনাদের মাধ্যমে সরকারের নিকট দেশের ৮০% ডিমের যোগানদার জেনারেল (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) খামারিদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কতিপয় জোরালো দাবি তুলে ধরতে চাই ও বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা চাই-
- বর্তমানে ডিমের দামের (ফার্ম গেইট প্রাইস) পতনে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জরুরি ভিত্তিতে নগদ আর্থিক প্রনোদনার ব্যবস্থা করা, যেহেতু সরকার ডিমের মুল্য নির্ধারন করে দিয়েছেন (কৃষি বিলনন আইন ২০১৮ অনুসারে) সেহেতু সরকারের উৎপাদনকারী টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ও ডিমের উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখতে অর্থ মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল গঠন করে স্বল্প (নামমাত্র সুদে) সুদে- দ্রুত সময়ে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা,যেন এই সকল খামারিরা বর্তমান সংকট কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।
- কৃষি শিল্পের মত পোল্ট্রি খামারের বিদ্যুৎ বিলে ২০% রিবেট প্রদান ও তার জন্য সর্ত সহজ করা (শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স ও প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের রেজিষ্ট্রেশন দিয়ে এই সুযোগ প্রদান করা)। আমাদের আহবান থাকবে- জেনারেল
- (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) খামারিদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় যেন অতিদ্রুত উদ্যোগ গ্রহন করেন।
- প্রতি বছর রমজান মাসে সারা দেশে বা লেয়ার ফার্ম ঘন (যেখানে সবচেয়ে বেশি ডিম উৎপাদন হয়) জেলাগুলোতে প্রানিসম্পদ অধিদপ্তর,কৃষি বিপনন অধিদপ্তর ও ভোক্তা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত মনিটরিং টিমের মাধ্যমে প্রানি সম্পদ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত জেনারেল( ক্ষুদ্র ও মঝারি) খামারিদের ডিম সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- বর্তমান সময়ে বিভিন্ন উপকরনের মুল্যে বৃদ্ধির বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে ডিম মুরগির সরকার ঘোষিত যৌক্তিক দাম অনতিবিলম্বে পূ:ণ নির্ধারণ করার জোর দাবি জানাই।
- ডিমের উৎপাদন খরচ কমাতে জেনারেল খামারিদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে পোল্ট্রি শেড নির্মাণ,খাঁচা তৈরি/ক্রয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা নির্মানের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহনের জোর দাবি জানাই।
- ডিম মুরগির বাজারে ফড়িয়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ব কমানোর জন্য, ডিম মুরগির বাজার ব্যবস্থায় দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের নিকট জোর দাবি জানাই।
- পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে আগামী দিনে ডিম মুরগির চাহিদা বৃদ্ধির সাথে উৎপাদন ও যোগানের সাথে তাল মিলিয়ে ডিম মুরগির গুনগত মান বজায় রাখা,নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, ডিম ও মুরগির মাংসের আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পথ উম্মুক্ত করতে “জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড” গঠনের জোর দাবি উপস্থাপন করছি।
পরিশেষে প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, পবিত্র রমজানে বাংলাদেশের জেনারেল (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) খামারিদের বর্তমান সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের আহবানে সাড়া দিয়ে আজকের মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহন ও তাঁদের সংকট ও সমস্যার কথা আপনাদের বহুল প্রচারিত/প্রকাশিত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার করে, দেশের আপামর ভোক্তা সাধারণ ও খামারিদের সুরক্ষায় অন্তরিক অবদান ও অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার আবেদন জানাই।
ধন্যবাদান্তে
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন (বি পি আই এ)
কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি
তারিখ: ২৫/০৩/২০২৫ ইং
ঢাকা, বাংলাদেশ।।